ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঢাকায়, বেশি হচ্ছে ফুসফুসের ক্যান্সার

হাসপাতালে ক্যান্সার প্রতিকারে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন একজন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

হাসপাতালে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন একজন রোগী

বাংলাদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের বাসিন্দাই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারেই বেশি মানুষ আক্রান্ত হন।

বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশেষায়িত এবং সমন্বিত চিকিৎসার সুযোগ সম্বলিত একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল তাদের কাছে সেবা নিতে আসা রোগীদের উপর গবেষণা করে তৈরি একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে।

এতে বলা হচ্ছে, গত তিন বছরে যারা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে এই প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গেছেন তাদের মধ্যে গড়ে ৩৩ শতাংশের বেশি মানুষ ঢাকা ও এর আশপাশের জেলার বাসিন্দা ছিলেন।

এরপরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। সেবা নিতে আসা প্রায় ২২ শতাংশ রোগী চট্টগ্রাম বিভাগের। পর্যায়ক্রমে এর পরের বিভাগগুলো হচ্ছে বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট।

গত তিন বছরে যেসব ক্যান্সারে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৭.৪ শতাংশই ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগেছেন। এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন পুরুষরা।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে যে, ২০১৮ সাল থেকে শুরু করে ২০২০ সাল পর্যন্ত- এই তিন বছরে তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে এসেছে প্রায় ৮৪ হাজার রোগী। এদের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে বলে হাসপাতালের রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে।

যেসব রোগী ক্যান্সার আক্রান্ত হয়েছেন তার মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিবন্ধিত হয়েছেন ৬২২৭ জন। এটি মোট আক্রান্তের ছয় ভাগের এক ভাগের বেশি।

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে ৫২০০ জনই পুরুষ। বাকি ১০২৭ জন নারী।

এই প্রতিষ্ঠানের ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, যেসব রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন তাদের সবার মধ্যেই ক্যান্সার নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি যারা নিবন্ধিত হননি তাদের মধ্যে যে ক্যান্সার নেই সেটি বলা যাবে না। কারণ এর মধ্যে অনেকেই একবার হাসপাতালে গিয়ে দ্বিতীয়বার হয়তো যাননি। যার কারণে তাদের মধ্যে কেউ ক্যান্সার আক্রান্ত কিনা সেটি জানা যায়নি।

“আমাদের দেশে তো ওই ব্যবস্থা নেই যে কোন রোগী একবার এসে, পরে কেন আসলো না, সেটি যোগাযোগ করে জানা যাবে,” বলেন তিনি।

এদিকে অন্যসব বিভাগের তুলনায় ঢাকায় কেন ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেশি সে বিষয়ে জানতে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান এই গবেষক। তার  জন্য স্থানভিত্তিক জনমিতি মূলক গবেষণা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্তদের মধ্যে ৫২০০ জনই পুরুষ।

ফুসফুসের ক্যান্সার বেশি কেন?

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্যই দায়ী তামাকের ব্যবহার বা ধুমপান।

সেদিক থেকে পুরুষরা বেশি ধুমপায়ী হয়ে থাকেন বিধায় এই রোগে পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি থাকে।

গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ক্যান্সার আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে গড়ে ৭১ শতাংশের বেশি কোন না কোন সময় ধুমপায়ী ছিলেন। আর গড়ে ২৫ শতাংশের বেশি বর্তমানে ধুমপায়ী।

এছাড়া ক্যান্সার আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে ৬১ শতাংশই তামাক চিবিয়ে খাওয়ায় অভ্যস্ত। উভয় ক্ষেত্রেই নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

৮৫ থেকে ৯০ ভাগ ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্যই দায়ী ধুমপান

মি. তালুকদার বলেন, ধুমপানের একটা প্রভাব আছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এটা বেশি। এছাড়া পুরুষরা নারীদের তুলনায় বেশি বাইরের পরিবেশ ও দূষণের মুখে পড়ে বলে মনে করেন তিনি।  

ফুসফুসের ক্যান্সারের আরো যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে গৃহস্থালীর ধোঁয়া, বায়ু দূষণের সাথে জড়িত বিষয় যেমন গাড়ির কালো ধোঁয়া, ফ্যাক্টরির ধোঁয়া ইত্যাদি ফুসফুসের ক্যান্সার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে।

পুরুষদের ক্যান্সার

২০১৮ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছরে গড়ে ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে পুরুষরা। এই হার ৫৫শতাংশ। আর নারীদের হার ৪৫শতাংশ।

বাংলাদেশে পুরুষরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন ফুসফুসের ক্যান্সারে। পুরুষদের যেসব ক্যান্সার হয় তার মধ্যে শুধু ফুসফুসের ক্যান্সারে ভোগেন ২৬.৬ শতাংশ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

গাড়ির কালো ধোঁয়া, ফ্যাক্টরির ধোঁয়া ইত্যাদি ফুসফুসের ক্যান্সার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে

এরপরেই রয়েছে খাদ্যনালীর ক্যান্সার। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪.৯ শতাংশ পুরুষ খাদ্যনালীর ক্যান্সারে ভোগেন।

এছাড়া পুরুষরা আক্রান্ত হন এমন ক্যান্সারগুলোর মধ্যে প্রথম দিকে রয়েছে পাকস্থলীর ক্যান্সার ৫.২%, লসিকা গ্রন্থি ৫.০, লিভার ৪.৮, মলাশয়, রক্ত, গাল, জিহ্ববা ও পিত্তথলির ক্যান্সার।

নারীদের ক্যান্সার

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে যে, দেশে ফুসফুসের ক্যান্সার ছাড়া অন্য যে দুটি ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে তা হচ্ছে স্তন ক্যান্সার এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সার। এই দুটি ক্যান্সারেই আক্রান্ত হন নারীরা।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মোট ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে স্তন ক্যান্সার। মোট ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে ১৩.৪ শতাংশ স্তন ক্যান্সারে ভোগেন।

আর নারীরা যেসব ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তার মধ্যে ২৯.৩ শতাংশই স্তন ক্যান্সারে ভোগেন।

গবেষকরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশ নয় বরং সারা বিশ্বেই স্তন কান্সারে সবচেয়ে বেশি নারী আক্রান্ত হন।

নারীদের ক্যান্সারের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। অন্তত ১৪.৩ শতাংশ নারী এই রোগে আক্রান্ত হন।

তবে ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত মনে করা হতো যে, নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় জরায়ুমুখের ক্যান্সার যা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

স্তন এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সার- এই দুটি ক্যান্সারেই আক্রান্ত হন নারীরা

নতুন এই গবেষণা অনুযায়ী, ১০.৯ শতাংশ নারী জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

এছাড়া ফুসফুসের ক্যান্সার, গালের ক্যান্সার, পাকস্থলী, খাদ্যনালী, মলাশয়, পিত্তথলি, লিভার ও লসিকা গ্রন্থির ক্যান্সারেও আক্রান্ত হন নারীরা।

এই গবেষণায় বলা হচ্ছে, যেসব নারী ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের সবাই গৃহিনী।

তবে অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলছেন, এই তথ্যের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেকে ক্ষেত্রে রোগীরা সঠিক তথ্য দেয় না, আবার গবেষণায় মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেছেন তাদেরও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

স্তন ক্যান্সার বেশি হওয়ার কারণ কী?

অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় সারা বিশ্বেই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।

এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বলেন, স্তন ক্যান্সার যেসব কারণে হয় তাদের মধ্যে অনেকগুলোই আসলে প্রতিরোধের কোন উপায় থাকে না। যার কারণে এতে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি থাকে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

নারীদের বয়স যত বাড়ে তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বাড়ে

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, নারীদের বয়স যত বাড়ে তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি তত বাড়ে। এছাড়া কারো পারিবারিক ইতিহাস অর্থাৎ মা, খালা বা পরিবারের অন্য কেউ আগে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে তারও এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

এসট্রোজেন নামে যে হরমোন নারীদের দেহে থাকে যার প্রভাবে ঋতুস্রাব হয় সেটিও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মি. তালুকদার জানান, যাদের অল্প বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হয় এবং বেশি বয়স পর্যন্ত থাকার পর বন্ধ হয়, তাদের স্তন ক্যান্সানের ঝুঁকি থাকে।

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো না হলেও এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া দেহের ওজন যত বাড়বে বা মুটিয়ে গেলে এসট্রোজেনের নিঃসরণ বাড়ে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে।

নারীদের দেহে জিনগত কিছু বিষয়ের জন্য যেমন অস্বাভাবিক জিনগত মিউটেশন(বিভাজন) হলে এই ক্যান্সার হতে পারে।

এছাড়া বিশ্বায়নের ফলে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, ধুমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, দেরীতে বিয়ে এবং সন্তান জন্মদানও স্তন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কারণ

অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ৯৫ ভাগের বেশি ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস নামে এক ধরণের জীবাণু।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

৯৫ ভাগের বেশি ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের সাথে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস জড়িত

নানা কারণে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন নারীরা। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব।

এছাড়া একাধিক সঙ্গীর সাথে যৌন মিলনের ফলেও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস, অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান জন্মদান, অনেক সন্তানের মা হওয়া, ঘন ঘন সন্তান জন্মদান ইত্যাদি কারণেও জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন নারীরা।

মি. তালুকদার বলেন, “বিশ্বায়নের ফলে একদিকে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, আবার একই সাথে পল্লী অঞ্চলে অপুষ্টি, বাল্যবিয়ে, বেশি সন্তান জন্মদানের মতো কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে।”

“আমরা একটা দ্বিমুখী চাপের মধ্যে আছি,” বলেন তিনি।

প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যারা ক্যান্সার আক্রান্ত হিসেব নিবন্ধিত হয়েছেন তাদের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটা বড় অংশই নিরক্ষর।