বিয়ের বাইরে যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করে ইন্দোনেশিয়ায় কঠোর আইন

  • Author, ফ্রান্সেস মাও
  • Role, বিবিসি নিউজ
নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভ করেছে কিছু মানুষ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের বাইরে বিক্ষোভ করেছে কিছু মানুষ

ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্ট এক নতুন ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করেছে। সেই সাথে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

 ইন্দোনেশিয়ায় কেউ বিয়ে না করে যৌনসম্পর্ক করলে নতুন আইনে তার এক বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। এই আইনটি কার্যকর হবে তিন বছরের মধ্যে।

 মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটিতে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা যখন বাড়ছে, তখন এই আইন করা হলো।

 সমালোচকরা এই আইনকে দেশটিতে মানবাধিকারের জন্য এক ‘বিপর্যয়’ বলে বর্ণনা করে বলেছেন, একটি ইন্দোনেশিয়ায় বিনিয়োগ এবং পর্যটনের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

 এ সপ্তাহে জাকার্তায় পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে কিছু তরুণকে আইনটির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। এই নতুন আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 নতুন আইনটি ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক এবং বিদেশি- সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এমনকি যারা বালি দ্বীপের মতো অবকাশ কেন্দ্রে বেড়াতে যাচ্ছেন, তাদের বেলাতেও। আইন অনুযায়ী অবিবাহিত দম্পতিরা সেক্স করতে গিয়ে ধরা পড়লে তাদের একবছর পর্যন্ত জেলে থাকতে হবে।

 অবিবাহিত দম্পতিদের এক সঙ্গে থাকাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি অমান্য করলে ছয় মাসের সাজা হবে।

 পশ্চিম জাভার ডেপক শহরের বাসিন্দা আজেং (২৮) বিবিসিকে বলেন, নতুন আইনের ফলে তিনি এখন ঝুঁকিতে আছেন। কারণ গত পাঁচ বছর ধরে তিনি তার পুরুষ সঙ্গীর সাথে বসবাস করছেন।

 “নূতন আইনের ফলে এখন আমরা দুজনই ঝুঁকিতে। যদি আমাদের কোন একজনের পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করে বসে, আমাদের জেলে যেতে হতে পারে”, বলছেন তিনি।

 “যদি পরিবারের কোন সদস্যের সঙ্গে আমার বিবাদ থাকে এবং আমাকে যদি তিনি জেলে পাঠাতে চান, তখন কী হবে?”

  “আমার তো মনে হয় এক সঙ্গে বাস করা বা বিয়ে না করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা কোন অপরাধ হতে পারে না। আমার ধর্মে এটা পাপ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু আমার মনে হয় না একটা ধর্মের ওপর ভিত্তি করে কোন ফৌজদারি আইন হওয়া উচিৎ।”

 

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান,

পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক মেলা-মেশার কারণে এক নারীকে দোররা মারা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার কিছু অঞ্চলে কঠোর শরিয়া আইন চালু আছে।

আজেং জানান, ২০১৯ সালে যখন প্রথম এই আইনের প্রস্তাব করা হয়, তখন তিনি এটির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছিল তাতে অংশগ্রহণ করেন।

 কিন্তু মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে এই নতুন ফৌজদারি বিধি অনুমোদন করেছে, যাতে প্রায় ছয়শো অনুচ্ছেদ রয়েছে।

 অধিকার কর্মীরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়ার এই নতুন ফৌজদারি বিধির কারণে নারী, এলজিবিটি এবং সংখ্যালঘুরাই বেশি সমস্যায় পড়বেন।

 ইন্দোনেশিয়ার ব্যবসায়ীরাও এই আইনের বিরুদ্ধে, তারা বলছেন এটি বিনিয়োগ এবং পর্যটনকে নিরুৎসাহিত করবে। কিন্তু পার্লামেন্টের সদস্যরা ওলন্দাজ আমল থেকে বহাল পুরনো ফৌজদারি বিধি পাল্টে নতুন এই ফৌজদারি বিধি পাস হওয়ার পর এটিকে স্বাগত জানান।

 ইন্দোনেশিয়ার আইন মন্ত্রী ইয়াসোনা লাওলি পার্লামেন্টে বলেন, “যে ঔপনিবেশিক ফৌজদারি আইন আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলাম, তা পেছনে ফেলে নতুন পেনাল কোড অনুমোদনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে।”

 নতুন ফৌজদারি আইনে অনেক নতুন বিধি যোগ করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে অনৈতিকতা এবং ব্লাসফেমি ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে। এছাড়া অনেক রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে।

 হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডিরেক্টর এলানি পিয়ার্সন বিবিসিকে বলেন, “যে দেশটি নিজেদের একটি আধুনিক মুসলিম গণতন্ত্র বলে দেখাতে চাইছে, এর মাধ্যমে সেই দেশ যেন অনেক পিছিয়ে গেল।

সংস্থার জাকার্তা-ভিত্তিক একজন গবেষক আন্দ্রেস হারসানো বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় লাখ লাখ দম্পতি আছেন, যাদের কোন বিয়ের সার্টিফিকেট নেই, বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে, এবং গ্রামাঞ্চলে থাকা দরিদ্র মুসলিমদের মধ্যে। এরা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মেনে বিয়ে করে।”

 তিনি বলেন, “এরা সবাই এখন আইন ভঙ্গ করার ঝুঁকির মধ্যে আছে, কারণ এক সঙ্গে থাকার কারণে তাদের ছয় মাস পর্যন্ত জেল হতে পারে।”

ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯৮ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশটির কিছু কিছু অঞ্চলে কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন জারি করা হয়। আচেহ প্রদেশে এরই মধ্যে কঠোর শরিয়া আইন জারি আছে। সেখানে জুয়া, মদ পান বা বিপরীত লিঙ্গের কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে শাস্তির বিধান আছে।

 ইন্দোনেশিয়ার অনেক ইসলামিক গোষ্ঠী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির নীতি নির্ধারণে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের জন্য চাপ দিচ্ছে।

বিবিসির দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সংবাদদাতা জনাথান হেড বলেন, ইন্দোনেশিয়া কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয় এবং সেখানে নাস্তিকতাও গ্রহণযোগ্য নয়- লোকজনকে ছয়টি অনুমোদিত ধর্মের যে কোন একটির অনুসারী হতে হয়।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা উত্তর নেতা সুকর্ণ যে নীতি অনুসরণ করতেন, সেখানে কোন একটি ধর্মকে অন্য ধর্মের ওপর প্রাধান্য না দেয়ার নীতি অনুসরণ করা হতো। এটির উদ্দেশ্য ছিল, যেসব দ্বীপপুঞ্জে অমুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা যেন ইন্দোনেশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়।

প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর আমলে ইসলামী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। কিন্তু সুহার্তোর পতনের পর ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামী রক্ষণশীলতা বাড়তে থাকে এবং ইসলামী গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত হতে থাকে। 

জাভা, যেখানে ইন্দোনেশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বাস করে, সেখানে অনেক গোষ্ঠী বাইরের প্রভাবের কারণে ইসলাম বিপন্ন এরকম একটা ধারণা প্রচার করতে থাকে। আর রাজনৈতিক দলগুলোও নৈতিকতার ওপর নজরদারির দাবি জানিয়ে কঠোর আইন করার কথা বলতে থাকে।

ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো যদিও ইসলামের একটি উদারপন্থী ধারা থেকে এসেছেন, কট্টরপন্থীদের দাবির মুখে তিনি ছাড় দিতে রাজী, এমন বার্তাই দিয়েছেন। জাকার্তার সাবেক গভর্নর আহকের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ এনে তাকে জেলে পাঠানোর ঘটনায় সেটাই দেখা গেছে।