রোহিঙ্গা সংকট: এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।
ছবির ক্যাপশান,

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের সামরিক সরকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং-এর সাথে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় এবারও চীন মধ্যস্থতা করবে।

এর আগে দুই দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে প্রায় তিন বছর স্থবিরতার পর এবারে সমাধানের আভাস দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

তিনি জানান যে আগের সব চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমারের সামরিক সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করবে।

পরিচয় যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে।

রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার নিরাপত্তা দেয়ার কথা বলেছে, সেইসাথে প্রথম ব্যাচ ফেরত নিতে আলোচনা চলছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।

তবে কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং এবারে যাচাই বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি কিভাবে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা

মি. মোমেন বলেন, "চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে মূলত আমাদের রোহিঙ্গা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সুখবর হচ্ছে- মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক সরকার আমাদের সাথে আগের সব চুক্তিকে সম্মান করে তাদের সব রোহিঙ্গাকে নিয়ে যাবে, যাচাই বাছাইয়ের পর। তারা এখনও বলেছে, তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেবে। যাতে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় সেখানে যেতে পারে।"

এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রত্যাবাসনের তারিখ ঘোষণা করেছিল দুই দেশ। কিন্তু রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হওয়ায় সেটা পণ্ড হয় যায়।

একইভাবে ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নাগরিকত্বের বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে চায়নি।

রাখাইনে এই স্বেচ্ছায় ফেরার বিষয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে ছিল জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর।

পরিচয় যাচাই বাছাই করে ওইবার সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গার তালিকা ইউএনএইচসিআর-কে দিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কিন্তু রোহিঙ্গারা যে সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে এসেছে, সেই অবস্থায় এই পরিচয় যাচাই-এর বিষয়টি মিয়ানমারকে শিথিল করতে বলেছে চীন। এমনটাই জানিয়েছেন মি. মোমেন।

তিনি জানান, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হচ্ছিল, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছিল, এই অবস্থায় তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসে।

"তখন তো কেউ ডকুমেন্ট (নথিপত্র) নিয়ে আসেনি। কিন্তু মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এই নথিপত্রের ওপর খুব জোর দিচ্ছে। এটা বেশ সমস্যা। আবার যারা কাগজপত্র এনেছে তাদের ক্ষেত্রে হয়তো দেখা যায় একটি পরিবারের শুধু নারী সদস্যের কাগজ রয়েছে। তার স্বামী সন্তানের নেই," বলেছেন মি. মোমেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার সবার কাগজ আলাদাভাবে চাওয়ায় পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই অনেকের কাগজ থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী সমাধান করা যাচ্ছে না।

এক্ষেত্রে চীন মিয়ানমারকে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অনুরোধ জানিয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, "চীনারা বলছে, নিতে হলে ঠিকমতো নিয়ে যাও। ছোটখাটো বিষয়, তাদের কাগজ আছে নাকি নাই ফরগেট অ্যাবাউট ইট- (এটা ভুলে যাও)।"

ছবির ক্যাপশান,

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সমাবেশ

এর আগে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই'র মধ্যস্থতা কামনা করেছিল বাংলাদেশ।

চীনের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মি. মোমেন এ সহযোগিতা চেয়েছিলেন।

সম্প্রতি ঢাকার এক অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন মধ্যস্থতা করছে, এক্ষেত্রে তারা কোন পক্ষপাতিত্ব করছে না।

ইতোমধ্যে নিউইয়র্ক ও বেইজিংয়ে তিন দফা বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি বৈঠকেই প্রত্যাবাসন ইস্যুতে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে সব কাজেই তারা গোপনীয়তার রক্ষা করছেন। এখনই সব তথ্য গণমাধ্যমের সামনে আনা হবে না বলে লি জিমিং জানান।

তিনি বলেছেন, "চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। আমরা কয়েক দফা বৈঠক করেছি। ইতিমধ্যে আমাদের কিছু অর্জনও রয়েছে।"

কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. মোমেনের নির্দেশ অনুসারে কিছু অর্জন না করা পর্যন্ত নীরব থাকার কথা জানিয়েছেন তিনি।

"আমরা মিডিয়ার সামনে কিছু বলবো না। আমরা কাজ দিয়ে প্রমাণ করবো," তিনি জানান।

মি. জিমিং বলেন, "খুব সম্প্রতি আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমার সাথে কী কথা বলেছি, তাদের প্রতিক্রিয়া কি সে বিষয় আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সব জানাবো, গণমাধ্যমকে নয়।"

এছাড়া দুই দেশের জিরো পয়েন্টে যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান নিয়েছে তাদেরকেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে মিয়ানমারকে আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. মোমেন।

চীনের পাশাপাশি জাপান সরকারকেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে।